দুই বছরে ২ লাখ টন বোমা ফেলেছে ইসরাইল, মুছে গেছে গাজার ৯০% অবকাঠামো

ছবি : সংগৃহীত


অবরুদ্ধ গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরাইলি বাহিনীর অব্যাহত হামলার দুই বছর পূর্ণ হয়েছে আগামীকাল। গত দুই বছরে ফিলিস্তিনের এই উপত্যকায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরাইল। লেবাননের সংবাদমাধ্যম আল–মায়েদিন জানিয়েছে, গাজার সরকারি জনসংযোগ কার্যালয় আগ্রাসনের দুই বছর উপলক্ষে নতুন এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে পুরো চিত্রটি তুলে ধরা হয়েছে।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে চলমান ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত ৭৬ হাজার ৬০০ এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নিশ্চিতভাবে মৃত ৬৭ হাজার ১৩৯ জন। এছাড়া প্রায় সাড়ে ৯ হাজার মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ। নিহতদের অর্ধেকেরও বেশি নারী, শিশু ও প্রবীণ। কেবল শিশুদের মধ্যেই নিহত হয়েছে ২০ হাজারের বেশি, আর নারীর সংখ্যা ১২ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে। পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এমন ঘটনা ঘটেছে প্রায় ২ হাজার ৭০০টিরও বেশি, আর ৬ হাজার পরিবারে কেবল একজন সদস্য জীবিত আছেন।


গাজার অবকাঠামোও কার্যত নিশ্চিহ্ন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলি হামলায় অঞ্চলের ৯০ শতাংশ স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। ভূমির ৮০ শতাংশেরও বেশি এখন দখলদার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এই সময়ের মধ্যে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। গাজায় ক্ষুধা ও জাতিগত নিধনের নীতি চালাচ্ছে ইসরাইল, এমন অভিযোগও তুলেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।


প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দুই বছরে গাজায় দুই লাখ টনেরও বেশি বোমা ও বিস্ফোরক ফেলা হয়েছে। এমনকি মানবিক সহায়তার জন্য নির্ধারিত “নিরাপদ অঞ্চল” আল-মাওয়াসিও বারবার হামলার শিকার হয়েছে। শুধু এই এলাকাতেই ১৩০ বারের বেশি বোমা হামলা চালানো হয়েছে।


ইসরাইলি আগ্রাসনে ধ্বংস হয়ে গেছে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা। ৩৮টি হাসপাতাল ও ৯৬টি ক্লিনিক ধ্বংস বা অচল হয়ে পড়েছে, টার্গেট করা হয়েছে ১৯৭টি অ্যাম্বুলেন্স। নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৬০০ এর বেশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, ২৫৪ সাংবাদিক, ১৪০ সিভিল ডিফেন্স সদস্য এবং ৫৪০ মানবিক সহায়তাকর্মী। আহতের সংখ্যা ১ লাখ ৬৯ হাজার ছাড়িয়েছে, কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসার জায়গা নেই। বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি পাওয়া ২২ হাজার রোগী এখনো গাজার ভেতরেই আটকা।


খাদ্য ও ওষুধের অভাবে শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার শিশু মারাত্মক অপুষ্টি ও খাদ্য সংকটে ভুগছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ২৪ লাখ মানুষ এখন সম্পূর্ণভাবে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।


শিক্ষা খাতও ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার ৯৫ শতাংশ বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত, ১৬৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে। নিহত হয়েছে ১৩ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী, ৮৩০ শিক্ষক এবং ২০০ শিক্ষাবিদ। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ৮৩৫টি মসজিদ, ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি গির্জা, এমনকি কবরস্থান পর্যন্ত ধ্বংস করা হয়েছে।


অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক থেকেও এটি এক ভয়াবহ বিপর্যয়। গাজার ১৫টি খাতে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার বলে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে কেবল আবাসন খাতে ক্ষতি ২৮ বিলিয়ন, স্বাস্থ্য খাতে ৫ বিলিয়ন এবং শিক্ষা খাতে ৪ বিলিয়ন ডলার। কৃষি ও মৎস্য খাত প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে।


প্রতিবেদনটির শেষাংশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, গাজা পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ার আগেই যেন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অবরোধ তুলে দিয়ে সীমাহীন মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে বলা হয়েছে। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বহুবারের আহ্বান সত্ত্বেও নিরাপত্তা পরিষদের রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে এখনো কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত হয়নি।


দুই বছরের এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর গাজা এখন প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত। ঘরবাড়ি হারানো মানুষজন ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের ভাষায়, এটি “৭৩০ দিনের গণহত্যা ও জাতিগত নিধন।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন